
সারাদেশে একযোগে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ১০টায় বাংলা প্রথমপত্রের মাধ্যমে এ পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা চলবে বেলা ১টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হওয়া এ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী।
তবে এবার মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের ধস লক্ষ্য করা গেছে। একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার পরও এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেনি। ফলে পরীক্ষা শুরুর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী।
এদিকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পরীক্ষার্থীদের জন্য একাধিক কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এবারই পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার শুরু হয়েছে। সিসিটিভি নজরদারির পাশাপাশি এবার পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড রাখতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা চলবে ২ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ করতে হবে ১৫ আগস্টের মধ্যে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এরইমধ্যে পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করেছে।
এ বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছেন। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ২ লাখ ৮৬৯ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১৯ হাজার ৪৭২ জন।
পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হবে। এবার সারা দেশে ২ হাজার ৯৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৪৫টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ৪০টিই রাজধানী ঢাকায়।
পরীক্ষায় বসছেন না ৩৬% শিক্ষার্থী
এদিকে দেশব্যাপী একযোগে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। তবে মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের ধস লক্ষ্য করা গেছে। একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার পরও এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেনি। ফলে পরীক্ষা শুরুর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, দুই বছর আগে এই ব্যাচে মোট ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। কিন্তু চূড়ান্তভাবে ফরম পূরণ করেছে মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে, যেখানে ঝরে পড়ার হার সর্বোচ্চ ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ও গবেষকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষা না দেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে মেয়েদের বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ছেড়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া।
গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে গেলেন বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ।
অবশ্য গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ইদানীং পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, নিবন্ধন করার পর দুই বছরের বিভিন্ন সময়ের মধ্যে এই শিক্ষার্থীরা কার্যত পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এর কারণ বের করা যায় না। তবে তারা এ বিষয়ে একটি গবেষণা করার পরিকল্পনা করছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রবণতার উল্লেখযোগ্য কারণ। তবে এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি উদ্বেগের।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এই দুর্বলতাগুলো বের করা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।
কোন বোর্ডে কত শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। এক বছরে হারটি প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেননি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। অপরদিকে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফরম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না। তারা পরের বছর পরীক্ষায় বসে। এটা অন্যতম কারণ।
পরীক্ষার প্রস্তুতি: আজ শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে। ২১ দিনে লিখিত পরীক্ষা শেষ হবে। যেসব দিন পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী পরীক্ষা থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়ও (যেমন বাংলা ও ইংরেজি) অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কেউ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক উপস্থিত ছিলেন।